
শ্রীকান্তের ভ্রমণকাহিনী
শিবরাম চক্রবর্তী
দেশবিদেশ বেড়াতে তোমরা সকলেই খুব ভালোবাসো। সব ছেলেই ভালোবাসে। কিন্তু আমাদের শ্রীকান্তের ভ্রমণে আনন্দ নেই; তার কাছে ভ্রমণের মানেই হচ্ছে দেড় মণ বোঝা।
তার মামা ভারি কৃপণ। কোথাও যেতে হলে গোটা বাড়িখানাই যেন সঙ্গে নিয়ে যেতে চান। কে জানে, বিদেশে কোনো জিনিসের দরকার পড়লে যদি সেটা আবার পয়সা খরচ করে কিনতে হয়! কিন্তু শ্রীকান্তের এদিকে প্রাণ যায়। সেই বিরাট লটবহর তাকেই বইতে হয় কিনা! মালপত্র গাড়িতে তুলতেও শ্রীকান্ত, গাড়ি থেকে নামাতেও শ্রীকান্ত। স্টেশনে যে ‘কুলি’ নামক একজাতীয় জীবের অস্তিত্ব আছে, শ্রীকান্তকে দেখলে মামা সে কথা একেবারে ভুলে যান।
কেবল কুলির কাজ করেই কি শ্রীকান্তের ছুটি আছে? তাকে সারারাস্তা গাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে পাহারা দিতে হয়। মামার ধারণা, দরজার মুখে শ্রীকান্ত মাথা গলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে সে কামরার দিকে কেউ আর এগোবে না। কিন্তু হয় ঠিক উলটো। কয়েক গজ দূরে খালি কামরা থাকলেও সমস্ত যাত্রীর যেন ওই কামরাতেই ঢোকার আগ্রহ। শ্রীকান্তকে দেখে লোকের কৌতূহল আরও বেড়ে যায়।
মামা পারতপক্ষে মেলগাড়িতে চড়েন না। প্যাসেঞ্জার গাড়িতে গেলে যদি দু-চার পয়সা বাঁচে, তবে সেটাই তাঁর কাছে বড় কথা। সময়ের আর কী মূল্য আছে বলো! দু-ঘণ্টা পরে পৌঁছে যদি দুটো পয়সা বাঁচানো যায়, সে তো লাভই। প্যাসেঞ্জার ট্রেন সব স্টেশনে থামে; দু-তিন মিনিট অন্তর শ্রীকান্তকে আবার দরজায় গিয়ে দাঁড়াতে হয়। রাতেও রেহাই নেই। মামা আরামপ্রিয় মানুষ। ঘুমের মধ্যে যদি কোনো অনাহূত লোক এসে বসার জায়গা চায়, সে যে কী বিপদ হবে, শ্রীকান্ত ভেবেই পায় না। তাই রিজার্ভ কামরার নোটিশবোর্ডের মতো তাকে দরজায় ঝুলে থাকতে হয়।
এই সব কারণে ভ্রমণে শ্রীকান্তের সুখও নেই, শখও নেই। কিন্তু না চাইলেও অনেক জিনিসই জীবনে এসে পড়ে। হাম হতে কে চায়? তবু হাম হয়। পরীক্ষায় ফেল করতে কোন ছেলে চায়? তবু কাউকে না কাউকে ফেল করতেই হয়। আজ তেমনই শ্রীকান্তকে বেড়াতে যেতে হচ্ছে।
ছ্যাকরা গাড়ির ছাদে যত জিনিস ধরার কথা তার অন্তত চার গুণ চাপানো হয়েছে। গাড়ির মধ্যে শ্রীকান্ত, মামা, মামী আর মামাতো বোন টেঁপি। ফাঁকফোকরেও মালের কমতি নেই—জলের কুঁজো, হ্যারিকেন লণ্ঠন, হাতব্যাগ, ছাতা, পানের ডিবে, খাবারের চাঙারি, টুকরোটাকরা আরও কত কী! অবশ্য এসব ছোটখাটো জিনিসের কিছু কিছু দায়িত্ব ভাগ করা আছে। পানের ডিবে মামী সামলাবেন, খাবারের চাঙারি মামা; কিন্তু ছাদের বাক্স-তোরঙ্গ, বিছানার লাগেজ আর প্রকাণ্ড হোল্ডঅল যেন যাত্রার আগেই শ্রীকান্তের ঘাড়ে চেপে বসেছে।
শিয়ালদহ পৌঁছেই মামা সবার আগে নামলেন। নেমেই হাঁক দিলেন, “ওগো, হাতপাখাটা দাও তো! শ্রীকান্ত, মোটঘাট সব নামা। ও বাপু কোচম্যান, তুমি একটু ধরো, বুঝলে? আমি টিকিটগুলো কেটে আনি।” গাড়ি দাঁড়াতেই কয়েকজন কুলি এসে জুটেছিল। তারা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে মাল নামাতে যেতেই মামা হন্তদন্ত হয়ে ফিরে এলেন। “কী, তোমরা মাল নামাবে নাকি? আবদার তো কম নয়! কেন, আমাদের কি হাত-পা নেই?” একজন কুলি শ্রীকান্তের দিকে সহানুভূতির চোখে তাকিয়ে বলল, “ওই বাচ্চা ছেলে, ও কী করে পারবে বাবু?” “কেন পারবে না শুনি? ওদের বয়সে আমরা লোহা হজম করেছি। শ্রীকান্ত, সব চটপট নামিয়ে ফেল। ও ব্যাটাদের ছুঁতে দিসনে। যাও, যাও! এখন থেকেই ওকে সব শিখতে হবে। তোমরা সব যাও।” মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে কুলিদের তাড়িয়ে মামা আরও বললেন, “দেখো বাপু, মালে হাত দেবে না। পয়সা পাবে না—আগেই বলে দিচ্ছি।” তারপর টিকিট কাটতে চলে গেলেন।
শ্রীকান্তের ইচ্ছে হলো বলতে, লোহা হজম করা যদি সম্ভবও হয়, তা বলে লোহা বয়ে বেড়ানো যে সহজ হবে এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু তর্ক করে লাভ কী? সমালোচনা করলে তো বোঝার ওজন কমে না। সে আস্তে আস্তে বাক্সপেটরা, বিছানার লাগেজ, বাসনের থলে, সুটকেস, এমনকি জলের কুঁজোটাও নামিয়ে প্ল্যাটফর্মে স্তূপ করে রাখল।
টিকিট কেটে মামা ছুটতে ছুটতে ফিরলেন। “সর্বনাশ! গাড়ি ছাড়তে আর আট মিনিট! শ্রীকান্ত, এই সামান্য কটা জিনিস কামরায় তুলতে তোর কতবার লাগবে? বার তিনেক? প্রত্যেকবার দু-মিনিট হলে মোট ছ-মিনিট। হাতে আরও দু-মিনিট রইল—বেশ, গাড়ি ধরা যাবে। টেঁপি, তুই এখানে দাঁড়িয়ে জিনিস আগলা। শেষবার শ্রীকান্তের সঙ্গে আসবি। আমি আর তোর মা আগে গিয়ে একটা খালি কামরা দেখি।”
তারপর এক নিঃশ্বাসে নির্দেশ চলল—“শ্রীকান্ত, বড় ট্রাঙ্কটা মাথায় নে। তার ওপর ছোট সুটকেসটা চাপিয়ে দিচ্ছি। পারবি তো? বাঁ বগলে বিছানার লাগেজ, ডান হাতে বড় সুটকেস; বাঁ হাতে দুটো লণ্ঠন ঝুলিয়ে নে। দ্বিতীয়বার বাসনের থলে আর তোর মামীর তোরঙ্গটা আনবি। দৌড়ে যাবি, দৌড়ে আসবি—নইলে গাড়ি ফেল হয়ে যাবে। আমি এগোলাম।”
মামা তো এগোলেন। খানিক দূরে গিয়ে দেখেন শ্রীকান্তের দেখা নেই। ভেবেছিলেন ছেলেটা পেছন পেছন দৌড়চ্ছে। ফিরে এসে দেখেন, বোঝা নিয়ে শ্রীকান্ত একেবারে চিত্রপুত্তলিকার মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। “কী রে, এখানে দাঁড়িয়ে রয়েছিস যে? গাড়ি ফেল করবি নাকি?” “কী করব মামা, এগোতে পারছি না। বড্ড ভারী হয়েছে। টেঁপিকে বললাম, পেছন থেকে একটু ঠেলে দে, তাহলে এগোতে পারি।” টেঁপি সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি তুলল। “বাবা আমায় জিনিস আগলাতে বলেছে। আমি ওকে ঠেলতে গেলে এদিকে সব চুরি হয়ে যাবে। ওর আর কী! জিনিস কমে গেলে ওকে তো কম বইতে হবে!”
মামা মাথা চুলকে বললেন, “তাই তো! ভারি মুশকিল।” এবার একজন কুলি সাহস করে এগিয়ে এল। “খোকাবাবু সইতে পারবে না। সব ফেলে ভেঙেচুরে যাবে, আর এদিকে ট্রেনও ছেড়ে দেবে।” সত্যিই বড় মুশকিল। জিনিস পড়ে ভাঙলে নগদ লোকসান, গাড়ি ছেড়ে গেলেও ক্ষতি। অথচ ভেবে দেখারও সময় নেই। কাজেই বাধ্য হয়ে মামাকে দুজন কুলি ভাড়া করতে হলো। আধঘণ্টা আগে বেরোলে এই অপব্যয় হতো না; শ্রীকান্তই পাঁচ-ছবারে অল্প অল্প করে সব তুলে দিতে পারত। কিন্তু এখন আর উপায় কী?
অতঃপর যে শোভাযাত্রা শুরু হলো, তা দেখবার মতো। সামনে দুজন কুলি; দুজনের মাথাতেই প্রকাণ্ড তোরঙ্গ। একজনের বগলে বিছানার লাগেজ, অন্যজনের বগলে বাসনের থলে। মামী নিয়েছেন জলের কুঁজো, টেঁপি পানের বাটা। মামার এক হাতে ছোট হাতব্যাগ, অন্য হাতে তালপাখা। এতটুকু ভারেই মামা কাতর; ঘেমে উঠে তালপাখার হাওয়া খেতে হচ্ছে তাঁকে। আর সকলের পেছনে শ্রীকান্ত—প্রকাণ্ড ট্রাঙ্কের বোঝায় কুঁজো হয়ে হাঁটছে।
কামরায় উঠে মামা প্রথমেই লম্বা করে বিছানা পেতে ফেললেন। এতক্ষণ গুরুতর পরিশ্রম গিয়েছে—এবার পর্যাপ্ত বিশ্রাম দরকার। চলন্ত ট্রেনের হাওয়া গায়ে লাগতেই তিনি চোখ বুজে বললেন, “আহা, এতক্ষণে দেহটা জুড়োল! গোটা গাড়ি ভর্তি, কিন্তু এ কামরাটা বেশ খালি পাওয়া গেছে। কারও চোখে পড়েনি বোধ হয়।” আসলে মামার লটবহরেই ছোট কামরাটার প্রায় সব জায়গা ভরে গেছে। এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে শ্রীকান্ত তার ব্যথায় টনটন করা ঘাড়ে হাত বোলাচ্ছিল।
মামী জিজ্ঞাসা করলেন, “বড্ড লেগেছে নাকি রে?” শ্রীকান্ত অপ্রস্তুত হয়ে হাত সরিয়ে নিল। “না, মামীমা।” মামা বললেন, “ওয়েট-লিফটিং খুব ভালো এক্সারসাইজ। এতে ওর ঘাড় শক্ত হবে। সেটা দরকার। এর পরেও ওর—” মামা ‘বইয়ের বোঝা’ বললেন, না ‘বউয়ের বোঝা’, শ্রীকান্ত ঠিক বুঝতে পারল না। মামী বললেন, “যাচ্ছি তো কদিনের জন্য, একটা বিয়ের নেমন্তন্ন খেতে। এত মালপত্র নিয়ে বেরোনো কেন? কী কাজে লাগবে এসব?” মামা বললেন, “রাখে হরি তো মারে কে—শোনোনি? সব জিনিসই কোনো না কোনো সময় কাজে লাগে। দরকারের সময় একটা জিনিস কাছে না পেলে তখন বুঝবে।”
মামী কিন্তু অন্য চিন্তায়। “মদনপুরে তো ট্রেন দাঁড়ায় মোটে এক মিনিট, তাও কখনো তার কম। ওইটুকু সময়ে এত বাক্সপেটরা নামানো যাবে কী করে? দেখো, শেষে সব গাড়িতে থেকে যাবে।” “কিচ্ছু ভেবো না গিন্নি,” মামা নিশ্চিন্তে বললেন। “ভাগ্যবানের বোঝা ভগবান বয়।” এ কথা শুনে শ্রীকান্তের বুক ধড়াস করে উঠল। মদনপুরে ট্রেন যেখানে এক মিনিটও ঠিকমতো থামে না, সেখানে ‘ভগবান’-এর বদলে আর কাউকে সে কল্পনা করতে পারল না—নিশ্চয়ই সমস্ত বোঝা তাকেই নামাতে হবে। ভেবে তার ঘাড় আরও বেশি ব্যথা করতে লাগল।
দমদমে ট্রেন থামতেই কয়েকজন ফিরিঙ্গি যুবক কামরায় উঠল। মামার বিছানা ও মালপত্রের বহর দেখে তারা অবাক। একজন ভাঙা বাংলায় বলল, “টোমরা এ গাড়িটে কেনো, বাবু? এটা সাহেবডের জন্যে। দরজায় নোটিস দেখ নাই? টোমাডের নামিটে হবে।” সবে আরামে চোখ বুজেছেন, নামার কথা শুনে মামার মাথা গরম। “কেন নামতে যাব? আমরাও তোমাদের মতো খাঁটি ইউরোপিয়ান। চেয়ে দেখো, তোমাদের আর আমাদের গায়ের রং একরকমই!” “অল রাইট, ডেখি টোমরা নামবে কি না,” বলে যুবকেরা নেমে গেল। পরের স্টেশনে তারা একজন রেলকর্মচারীকে ডেকে আনল। কর্মচারীও এসে নামার অনুরোধ করলেন।
মামা বললেন, “সমস্ত গাড়ি ভর্তি, কেবল এই কামরাটা খালি। কোথাও জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়ে উঠেছি। অন্য কোনো কামরায়, দরকার হলে উঁচু ক্লাসে, আমাদের জায়গা করে দিন, আমরা নেমে যাব।” “আচ্ছা, দেখি জায়গা পাওয়া যায় কি না,” বলে কর্মচারী চলে গেলেন। ফিরিঙ্গিরা কিন্তু কামরাতেই রইল। শ্রীকান্ত ভয়ে কাঁটা। যদি সত্যিই অন্য কামরায় জায়গা পাওয়া যায়, তবে আবার এই পাহাড়প্রমাণ বোঝা তাকে টানতে হবে! ভাগ্যক্রমে কর্মচারী আর ফিরলেন না; গাড়িও ছেড়ে দিল। ফিরিঙ্গিরা নিজেদের মধ্যে গজরাতে লাগল। মামা তাদের দিকে ভ্রুক্ষেপ করলেন না। কিন্তু মামী বললেন, “কাজ নেই বাপু, পরের স্টেশনে অন্য কামরায় চল।” মামা বললেন, “কোথায় খালি কামরা রয়েছে?” “না থাকলে পরের গাড়িতে যাব।” “পাগল!”
শ্রীকান্ত বলল, “সবই তো পরের গাড়ি, মামীমা। কোনটা আর আমাদের নিজের গাড়ি?” সে আরেক দফা বোঝা টানা এড়াতেই কথাটা বলল। মামী ফিসফিস করে বললেন, “যদি পুলিশে ধরে নিয়ে যায়? সাহেবদের গাড়ি যে!” “চুপ করো,” মামা ধমকালেন। “ওরা বাংলা বোঝে। তুমি ভয় পেয়েছ বুঝলে আরও লাফাবে।”
অগত্যা মামী চুপ করে গেলেন। খানিক পর ব্যারাকপুর এলো। ট্রেন দাঁড়াতেই ফিরিঙ্গিরা এবার একজন সাহেব রেলকর্মচারীকে ডেকে আনল। তিনি এসে বললেন, “বাবু, টোমাডের নামিটে হইবে। যাহাদের সাহেবি ড্রেস, এ কেবল টাহাডিগের জন্য।”মামা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “তা একথা আগে বললেন না কেন, সাহেব? আমাদেরও সাহেবি পোশাক আছে। একটু সময় দিন, আমরা এখনই সাহেব সেজে নিচ্ছি। ওগো, ট্রাঙ্কের চাবিটা দাও তো!” সাহেব কর্মচারী কী বলবেন ভেবে না পেয়ে চলে গেলেন। মামার যে কোনো সাহেবি পোশাক ছিল না, তা বলা বাহুল্য। তিনি শুধু চাল দিয়েছিলেন। এদিকে ট্রেনও ব্যারাকপুর ছেড়ে চলল।
এবার ফিরিঙ্গিরা ঠিক করল, নিজেরাই পরিবারটিকে তাড়াবে। নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে এমন চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করল যে মামী ভয়ে সিঁটিয়ে গেলেন। মামার মনেও যে একটু ভয় ঢোকেনি, এমন নয়। মামী ফিসফিস করে বললেন, “হ্যাঁ গো, কামড়ে দেবে না তো?” মামা গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বললেন, “কে জানে!” কামড়ানোর কথা শুনেই টেঁপি তার বাবার বিরাট শরীরের আড়ালে আশ্রয় নিল। মামা একটু চিন্তা করে হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন। “শ্রীকান্ত, তুই কুকুরের ডাক ডাকতে পারিস?” “বেড়ালের ডাক খুব ভালো পারি মামা। ডাকব? ম্যাঁও—” “না, না! বেড়াল ডাকতে হবে না। মাঝে মাঝে তুই কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করবি।” শ্রীকান্ত শুরু করল, “ঘেউ! ঘেউ!” “আরও জোরে!” “ঘেউ! ঘেউ! ঘেউউউ!”
আচমকা এমন কুকুরের ডাক শুনে ফিরিঙ্গিরা থেমে গেল। একজন আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “ও ওরকম ডাকছে কেন?” মামা অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে বললেন, “ও কিছু নয়, সাহেব। দশ-বারো দিন আগে ওকে একটা পাগলা কুকুরে কামড়েছে। হাইড্রোফোবিয়া—বুঝলে?” ফিরিঙ্গিরা যেন লাফিয়ে উঠল। “হাইড্রোফোবিয়া! আগে বলোনি কেন? ও কি আমাদের কামড়াতে পারে?” “না, না,” মামা আশ্বস্ত করলেন, “কামড়াবে না। সে ভয় নেই।” তবু তাদের আশ্বাস হলো না। নৈহাটিতে গাড়ি থামতেই সবাই হুড়মুড় করে নেমে পালাল। মামা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। “যাক, বাঁচা গেল!”
কিন্তু তাঁর আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। সেই কামরায় আরেকজন ফিরিঙ্গি যুবক উঠে বসল। সে কোনো উচ্চবাচ্য না করে একটি ডিটেকটিভ উপন্যাস বের করে পড়তে লাগল। শ্রীকান্ত আবার ঘেউ ঘেউ করতেই যুবক চমকে উঠে এবার বেশ পরিষ্কার বাংলায় জিজ্ঞাসা করল, “ব্যাপার কী? ওর কী হয়েছে?” যুবকের মুখে পরিষ্কার বাংলা শুনে মামাও বাংলাতেই উত্তর দিলেন, “কিছু না, জলাতঙ্ক। যাকে তোমরা হাইড্রোফোবিয়া বলো।” “ওঃ, তাই নাকি? ওতে ওর উপকার হবে,” বলে সে নির্বিকারভাবে বইয়ে মন দিল। মামার মেজাজ চড়ে গেল। তিনি বললেন, “তোমাকে সাবধান করা আমার কর্তব্য। কী জানি, যদি কামড়ে দেয়! তখন তোমারও এ রোগ হতে পারে।” যুবকটি মৃদু হেসে বলল, “আহা না না! যে কুকুর ডাকে, সে কি আর কামড়ায়?”
অগত্যা মামা হাল ছেড়ে দিলেন। শ্রীকান্তও ডাক বন্ধ করল। তাকে কুকুর বলে চালানোয় সে এমনিতেই রেগে ছিল। এবার তার মনে হলো, সত্যি সত্যি একবার ওই যুবককে কামড়ে দিলে কেমন হয়! কাঁচরাপাড়ায় গাড়ি থামতেই যুবকটি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে পরিচিত কয়েকজন বন্ধুকে দেখতে পেল। সে ডাকতেই সেই আগের ফিরিঙ্গি দল এসে উপস্থিত। কামরায় তাকে অক্ষত দেখে তারা অবাক হয়ে বলল, “তুমি নিরাপদে আছ তো? ওখানে যে মারাত্মক হাইড্রোফোবিয়া!” “সে আমি সারিয়ে দিয়েছি,” যুবকটি শান্ত গলায় বলল। “সারিয়ে দিয়েছ! কী রকম?”
তখন যুবকটি মামার সমস্ত ফন্দি ফাঁস করে দিল। সে কামরায় উঠেই শ্রীকান্তকে জল খেতে দেখেছিল। যার সত্যিই জলাতঙ্ক হয়েছে, তার পক্ষে জল খাওয়া সম্ভব নয়—অন্তত এমনটাই সে বুঝিয়েছিল। মামার চাল যে ভাঁওতা, তা আর গোপন রইল না।
শ্রীকান্তের রাগ এবার মামার ওপরই গিয়ে পড়ল। জলাতঙ্ক হলে জল খেতে নেই—এই কথাটা মামা আগে বলে দিলেন না কেন? তাহলে তাকে সবার সামনে এমন অপদস্থ হতে হতো না। বিশেষ করে ‘কুকুর’ হওয়ার অভিনয়টুকুও যে শেষ পর্যন্ত কাজে লাগল না, এ অপমান সে কিছুতেই ভুলতে পারল না। এবার ফিরিঙ্গিরা আবার কামরায় জাঁকিয়ে বসল। তারা স্পষ্ট ভাষায় মামাকে জানিয়ে দিল, পরের স্টেশনেই তাঁদের নামতে হবে।
মামী ভয়ে বললেন, “ওগো, কী হবে তাহলে?” মামা শান্ত গলায় বললেন, “কিছু ভেবো না গিন্নি। ভগবান যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন।” শ্রীকান্তের মনে আবার ভেসে উঠল সেই বিশাল লটবহরের কথা। ঘাড়ের ব্যথা কতটা কমেছে, তা জানার জন্য সে একবার সাবধানে ঘাড় নেড়ে দেখল। পরের স্টেশন আসতেই মামা বললেন, “এখানে তো নামা যায় না। পরের জংশনে বদলানো যাবে। এখানে গাড়ি মোটে মিনিটখানেক থামে। আমাদের এত মালপত্র!”
ফিরিঙ্গিরা জবাব দিল, “না, তা হবে না। এখানেই টোমাকে নামটে হইবে।” বলেই তারা নিজেরাই মামার বাক্স, তোরঙ্গ, বিছানা, সুটকেস নামাতে শুরু করল। একজন বাসনের থলেটা নামিয়ে বলল, “এই নাও টোমার বাসন! আর এই নাও টোমার জলের পিচার!”কুঁজোটি হাতছাড়া হতে দেখে মামী হায় হায় করতে লাগলেন। ততক্ষণে দুজন মিলে ভারী ট্রাঙ্কটাও নামিয়ে ফেলেছে। মামা তখন বাক্সের ওপর রাখা প্রকাণ্ড হোল্ডঅলটি দেখিয়ে দিলেন; সেটাও নেমে গেল। “বেঞ্চের তলায় আর-একটা তোরঙ্গ আছে—ওই যে!” মামা দেখিয়ে দিলেন। একজন সেটাও নামিয়ে বলল, “এই নাও টোমার তুরঙ্গ!” মামা সংশোধন করলেন, “তুরঙ্গ নয়, তোরঙ্গ।”
সর্বশেষে সেই শিক্ষিত যুবকটি ছোট হাতব্যাগটি মামার হাতে দিয়ে হেসে বলল, “গুডবাই, মিস্টার!”
মামা এতক্ষণ অত্যন্ত সন্তুষ্ট মনে তাদের কাজকর্ম দেখছিলেন। এবার স্টেশনের নামফলকটির দিকে তাকিয়ে উৎফুল্ল হয়ে বললেন, “বাঃ! এ তো মদনপুর! এইখানেই আমরা নামতাম। অতএব গুডবাই, মিস্টার্স—অ্যান্ড থ্যাঙ্ক ইউ!”






Comments