top of page

গড়িয়াহাটের নিশির সম্মেলন

Oct 5
2 min read

Utsav 2026 • দুর্গাপুজো বিশেষ সংখ্যা

হাসির হাওয়া — হাস্যরস, ব্যঙ্গ ও দৈনন্দিন অদ্ভুততা

লেখক: কল্লোল সাহা

রাত ঠিক সাড়ে বারোটা। গড়িয়াহাট বাজারের পিছনের এক সাধারণ গলি—শাটার নেমে গেছে, চায়ের দোকান ত্রিপলের নিচে ঘুমোচ্ছে, আর “মিতালি বিউটি পার্লার—শুধু মহিলাদের জন্য” লেখা সাইনবোর্ডের বাইরে একটি কাঁপতে-থাকা বাল্বই একমাত্র আলো। সেই গণতান্ত্রিক আলোর তলায় বসেছে এলাকার কুকুর-বিড়ালের মহাসভা। একে জনসম্মেলন বলা যেতে পারে, যদিও কে ডেকেছে তা কেউই ঠিক মনে করতে পারছে না।

সভাপতির আসনে মোতি—এককালে সাদা ছিল, এখন শহুরে ধুলোয় ধূসর; একটি কান নেই। নিজেই নিজেকে গলির ‘চেয়ারডগ’ ঘোষণা করেছে। সে গম্ভীর গলায় বলল, “কমরেডরা, আজকের আলোচ্য একটাই—শহরটা আবার মানুষের হাতে চলে গেছে।”

বুড়ি বিড়াল, ধূসর, মসৃণ এবং স্বভাবে দার্শনিক, থাবা চেটে বলল, “মানুষ কোনোদিন যায়নি, মোতি। ওরা শুধু নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ঝগড়া করার অভিনয় করে। আর উচ্ছিষ্ট পরিষ্কার করি আমরা।”

রবীন্দ্রনাথসদৃশ লোমশ দাড়িওয়ালা স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবী নেড়ি ভোম্বল বলল, “এবার ব্যাপার গুরুতর। সবজিবাজারে আমার সূত্র বলছে—বিপ্লব, পুনর্বিপ্লব আর উত্তর-বিপ্লব নিয়ে আলোচনা চলছে। পায়রারাও নাকি চাল মজুত করছে।” প্রাণী প্রজাতন্ত্রে সম্মিলিত শ্বাসরোধ হল।

চায়ের দোকানের পাশে বড় হওয়া টুনটুনি বিড়ালছানা নিষ্পাপ মুখে জিজ্ঞেস করল, “বিপ্লব কী? দুধ দিয়ে আসে?” বুড়ি বলল, “প্রায়। তবে দুধের চেয়ে বক্তৃতা বেশি থাকে।”

মোতি গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ল। “ঠিক তাই। সকালে মানুষ সূর্য বিরক্ত হওয়া পর্যন্ত স্লোগান দেয়। এক দল বলে—‘জয়ের মা, মাটির মানুষ!’ আর এক দল পাল্টা বলে—‘জয়ের বাবা ফেলুনাথ, গোবরেই সোনার হাত!’ তারপর সবাই বাড়ি গিয়ে নাশতা খায়। সম্পূর্ণ চক্রাকার ঘেউ-ঘেউ ব্যবস্থা। অত্যন্ত উন্নত।”

বুড়ি বলল, “আমরা যদি মানুষদের মতো রাজনীতি করি?” সঙ্গে সঙ্গে তিনটি কুকুর একই হাড়কে ‘ঐতিহাসিকভাবে আমাদের’ বলে দাবি করল। দু’টি বিড়াল দেয়ালের মালিকানা নিয়ে আলাদা দল গড়ল। একটি কাক জানাল, সে নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম, কিন্তু তাকে এক প্যাকেট বিস্কুট দিলে বিশেষ সংবাদ করতে আপত্তি নেই।

ভোম্বল প্রস্তাব দিল, “দল তৈরি হোক। স্ট্রিট ডগ ফ্রন্ট, ফেলাইন ফেডারেশন, পিজিয়ন প্রগ্রেসিভ ব্লক।” টুনটুনি বলল, “ইঁদুররা?” বুড়ি নিঃশ্বাস ফেলল, “ওরা সব সরকারের সঙ্গেই থাকে।”

আলোচনা যত এগোল, সভা তত মানবিক হয়ে উঠল। কে আগে খাবারের ডাস্টবিন পাবে, কার ঘুমের জায়গা ‘প্রাচীন অধিকার’, কোন পাড়ার কুকুর বহিরাগত—সব নিয়ে চিৎকার শুরু হল। শেষ পর্যন্ত মোতি টিনের ঢাকনায় থাবা মেরে বলল, “শান্ত! আমরা মানুষদের সমস্যা নিয়ে সভা ডেকেছিলাম। এখন নিজেরাই মানুষ হয়ে যাচ্ছি।”

ঠিক তখন পাশের ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে এক বৃদ্ধা প্রতিদিনের মতো বাসি ভাত আর মাছের কাঁটা নামিয়ে রেখে গেলেন। এক মুহূর্তে সমস্ত মতাদর্শ বিলীন। কুকুর, বিড়াল, কাক সবাই খাবারের দিকে এগোল—কেউ কারও দল জিজ্ঞেস করল না।

বুড়ি খেতে খেতে বলল, “এই হল আমাদের সংবিধান। ক্ষুধা যখন সত্যি, তর্ক ছোট হয়ে যায়।” ভোম্বল আপত্তি জানাতে চাইল, কিন্তু মুখে মাছের কাঁটা ছিল।

সকাল হওয়ার আগে সম্মেলন মুলতুবি হল। কোনো প্রস্তাব গৃহীত হল না, কোনো বিপ্লব ঘটল না, কোনো কমিটি ভাঙল না। শুধু মোতি সিদ্ধান্ত লিখে রাখল: “মানুষদের পর্যবেক্ষণ চলবে। তাদের অনুকরণ সীমিত রাখতে হবে। বিশেষত নির্বাচন এবং হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ।”

পূর্ব আকাশ ফিকে হতে থাকল। বাজারের প্রথম দোকান খুলল। চা-ওয়ালা হাই তুলে দেখল গলির প্রাণীরা যে যার জায়গায় বসে আছে। সে কিছুই বুঝল না। মানুষ সাধারণত রাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সভাগুলির খবর পায় না।

 
 
 

Comments


রাঁচি, কলকাতা এবং ইম্ফালে আমাদের সাথে সংযোগ করুন

​ মুঠোফোন : ​ 8292385665;  ই মেইল: info@dcdt.net

  • s-facebook
  • Twitter Metallic
  • s-linkedin
bottom of page