top of page
Search

মেদিনীপুরে মৎস্যমঙ্গল

 

গরমের ছুটি মানেই আমাদের কাছে তিনটে জিনিস—আম-কাঁঠাল, দুপুরবেলা লুডো, আর কলকাতার গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে পৃথিবী উদ্ধার করার প্ল্যান। আমরা চারজন—আমি পাটলা, আমাদের নেতা ভোঁদা ব্যানার্জি, সঙ্গে ক্যালকুলেটর-মাথা টিনটিন, আর সারাক্ষণ খিদে-পাওয়া কাবুল—সেই বছর ঠিক করলাম, কলকাতা আর নয়।আমরা যাব মেদিনীপুরের এক গ্রামে।কারণ ভোঁদা ঘোষণা করেছিল,“দ্যাখ পাটলা, মানুষকে প্রকৃতির কাছে ফিরতেই হবে। কলকাতার ফুচকা আর টেলিভিশন মানুষকে দুর্বল করে দিচ্ছে। আমরা মাছ ধরতে শিখব। তারপর একদিন গঙ্গার ওপর আন্তর্জাতিক মৎস্য সম্মেলন করব।”

আমি বললাম, “তুই আগে বালতিতে মাছ ধরতে শেখ।”

ভোঁদা চোখ বড় বড় করে বলল, “চুপ কর। ইতিহাসে যারা আগে বিদ্রূপ করেছে, পরে তারাই মূর্তি বানিয়েছে।”

আমাদের গন্তব্য ছিল মেদিনীপুরের এক গ্রাম—নাম বটতলা-গোপালপুর। নাম শুনেই কাবুল বলেছিল, “বটতলা থাকলে ছায়া থাকবে। গোপালপুর থাকলে দুধ থাকবে। আর মেদিনীপুর হলে নিশ্চয়ই মোয়া থাকবে।”

টিনটিন চশমা মুছতে মুছতে বলল, “মেদিনীপুরে মোয়া নয়, ময়না, পটাশপুর, কাঁথি, দিঘা, খেজুরি—এসব বেশি বিখ্যাত।”

কাবুল হাঁ করে বলল, “তা হলে মোয়া নেই?”

টিনটিন বলল, “থাকতেও পারে।”

কাবুল দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “বাঁচলাম।”

আমরা হাওড়া থেকে ট্রেনে উঠলাম। ভোঁদা হাতে একটা নোটবুক নিয়েছে—নাম দিয়েছে “ফিশারি রিসার্চ ডায়েরি”। প্রথম পাতায় লিখেছে:মাছের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক: এক বিপ্লবী অনুসন্ধান।

আমি বললাম, “মাছের সঙ্গে তোর সম্পর্ক এখনো কাঁটার মধ্যে সীমাবদ্ধ।”

ভোঁদা গম্ভীর মুখে বলল, “পাটলা, মহান ব্যক্তিদের শুরু সবসময় ভুল বোঝাবুঝি দিয়ে।”

ট্রেন যখন শহর ছাড়িয়ে মাঠের দিকে ঢুকল, ভোঁদার আত্মা আরও গ্রাম্য হয়ে উঠল। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “ওই দেখ, সবুজ বিপ্লব!”

টিনটিন বলল, “ওটা ধানক্ষেত নয়, পাটক্ষেত।”

ভোঁদা একটু থেমে বলল, “সবুজ তো? ব্যস। বিপ্লব আছে।”

স্টেশন থেকে আমাদের নিতে এসেছিলেন গ্রামের শিক্ষক বিরিঞ্চিবাবু, যিনি ভোঁদার পিসেমশাইয়ের বন্ধুর মামাতো ভাইয়ের জামাইয়ের প্রতিবেশী। সম্পর্কটা এত জটিল যে টিনটিন কাগজে ডায়াগ্রাম আঁকতে বসেছিল।বিরিঞ্চিবাবু আমাদের দেখে বললেন, “এসো এসো, কলকেতার পোলা-পানরা আইছো? গরমে কষ্ট হইব, কিন্তু মাটির হাওয়া ভালো।”

ভোঁদা সঙ্গে সঙ্গে হাত জোড় করে বলল, “আমরা গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে একাত্ম হতে এসেছি।”

বিরিঞ্চিবাবু হেসে বললেন, “তা আগে গামছা দিয়া ঘাম মুছো, তারপর একাত্ম হও।”

গ্রামে ঢুকতেই আমাদের শহুরে আত্মবিশ্বাসের অবস্থা কাঁচা পাঁপড়ের মতো হয়ে গেল। চারদিকে পুকুর, তালগাছ, আমগাছ, মাটির রাস্তা, উঠোনে হাঁস, ছাগল, মুরগি, আর দূরে কংসাবতী নদীর চর।কাবুল প্রথমেই একটা হাঁস দেখে বলল, “এগুলো কি সরকারি হাঁস?”

আমি বললাম, “হাঁসেরও আবার সরকার হয় নাকি?”

কাবুল বলল, “কলকাতায় সবকিছুরই ইউনিয়ন আছে। হাঁসদেরও থাকতে পারে।”

আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল বিরিঞ্চিবাবুর বাড়িতে। দুপুরে ভাত, ডাল, পোস্ত, আলুভাজা, কাঁচা আমের টক, আর পুকুরের টাটকা মাছের ঝোল খেয়ে কাবুল চোখ বন্ধ করে বলল, “আমি এখানেই থাকব। তোমরা কলকাতায় গিয়ে আমার শোকসভা করো।”

বিরিঞ্চিবাবু বললেন, “কাল ভোরে তোদের নিয়ে যাইব জেলে হরিপদর বাড়ি। ওরাই তোদের মাছ ধরা শেখাইব।”

ভোঁদা নোটবুক খুলে লিখল:প্রথম দিন: মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের সঙ্গে প্রাথমিক সংযোগ।

আমি পাশে লিখলাম:প্রথম দিন: কাবুল তিনবার ভাত নিল।

পরদিন ভোরে আমাদের ঘুম ভাঙল কাকের ডাক, গরুর ঘণ্টা, আর ভোঁদার বজ্রকণ্ঠে—“উঠো! উঠো! আজ ইতিহাস রচিত হবে!”

কাবুল কম্বলের নিচ থেকে বলল, “ইতিহাস কি আটটার পরে রচিত হতে পারে না?”

ভোঁদা বলল, “মাছেরা ভোরে ওঠে।”

টিনটিন বলল, “সব মাছ নয়। কিছু মাছ নিশাচর।”

ভোঁদা বলল, “তুই মাছদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বেশি জানিস কেন?”

আমরা গামছা, পুরনো প্যান্ট, আর বিরিঞ্চিবাবুর দেওয়া বাঁশের ছিপ নিয়ে বেরোলাম। হরিপদ জেলের বাড়ি পুকুরপাড়ে। হরিপদ কাকা লম্বা, কালো, শুকনো মানুষ, চোখে প্রচুর হাসি। তাঁর স্ত্রী ফুলেশ্বরী কাকিমা আমাদের দেখে বললেন,“আহা, কলকেতার বাবুরা মাছ ধরতে আইছে? আগে পুকুরে নামবা, না ছবি তুলবা?”

ভোঁদা বলল, “আমরা মাঠ পর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিতে এসেছি।”

ফুলেশ্বরী কাকিমা হেসে বললেন, “ওরে হরিপদ, এরা কথায় মাছ ধরবেক মনে হয়।”

হরিপদ কাকা বললেন, “দ্যাখো বাবুরা, মাছ ধরতে গেলে আগে চুপ থাকতে হয়।”

এই কথাটা শুনে আমি, টিনটিন আর কাবুল একসঙ্গে ভোঁদার দিকে তাকালাম।ভোঁদা আহত গলায় বলল, “তোমরা আমাকে সন্দেহ করছ?”

আমি বললাম, “না, আমরা মাছদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত।”

প্রথম শিক্ষা ছিল জাল ফেলা। হরিপদ কাকা কাঁধ থেকে গোল করে জাল খুলে এমনভাবে ছুড়ে দিলেন যে জালটা আকাশে ফুলের মতো খুলে পুকুরে পড়ল।ভোঁদা হাততালি দিয়ে বলল, “এক্সেলেন্ট! এবার আমি।”

হরিপদ কাকা একটু সন্দেহ নিয়ে বললেন, “আস্তে, আগে দাঁড়াও ঠিক করে।”

ভোঁদা জাল কাঁধে নিয়ে দাঁড়াল। তার মুখে এমন ভাব, যেন প্লাসির যুদ্ধের আগে সিরাজদ্দৌলা। সে বলল, “মাছ সমাজ, সাবধান!”

তারপর জাল ছুড়ল।

জাল পুকুরে পড়ল না।জাল গিয়ে পড়ল পাশের আমগাছে।

আমরা তিনজন মাটিতে বসে পড়লাম হাসতে হাসতে। আমগাছের ডালে জাল ঝুলছে, তার মধ্যে একটা কাক বসে কা কা করছে।ফুলেশ্বরী কাকিমা দূর থেকে চেঁচিয়ে বললেন, “বাবু, মাছ গাছে উঠেছে নাকি?”

ভোঁদা মুখ লাল করে বলল, “প্রথম পরীক্ষা। বাতাসের গতি মাপছিলাম।”

টিনটিন বলল, “বাতাসের গতি নয়, তোর বুদ্ধির গতি ধরা পড়েছে।”

হরিপদ কাকা মই এনে জাল নামালেন। তারপর বললেন, “ঠিক আছে, জাল থাক। আগে ছিপ ধরো।”

ছিপে টোপ লাগানো হলো—কেঁচো।কাবুল কেঁচো দেখে পিছিয়ে গেল।“এটা জীবন্ত?”

হরিপদ বললেন, “হ্যাঁ রে বাবু।”

কাবুল বলল, “তা হলে মাছকে খাওয়ানোর আগে ওর অনুমতি নেওয়া উচিত।”

ভোঁদা বলল, “এই হচ্ছে কলকাতার অতিরিক্ত শিক্ষার কুফল। কেঁচোর গণতন্ত্র!”

শেষে ফুলেশ্বরী কাকিমা নিজেই টোপ লাগিয়ে দিলেন। আমরা চারজন পুকুরের ধারে বসে রইলাম। পাঁচ মিনিট। দশ মিনিট। পনেরো মিনিট।মাছ নেই।কাবুল ফিসফিস করে বলল, “মাছরা কি আমাদের বয়কট করেছে?”

ভোঁদা বলল, “চুপ। ধ্যান কর। মাছ ধরা মানে মনোসংযোগ।”

ঠিক তখনই ভোঁদার ছিপ কেঁপে উঠল।ভোঁদা চেঁচিয়ে উঠল, “পেয়েছি! পেয়েছি! বিশাল! রুই! কাতলা! হয়তো হাঙর!”

হরিপদ কাকা দৌড়ে এলেন।ভোঁদা দুই হাতে ছিপ টানছে। মুখে ঘাম, চোখে আগুন। আমরা উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে।একটু পর ছিপের মাথা থেকে উঠে এল—একটা পুরনো গামছা।

আমি বললাম, “বাহ! টেক্সটাইল ফিশ!”

টিনটিন বলল, “সম্ভবত স্থানীয় জলাশয়ের বস্ত্রসম্পদ।”

কাবুল বলল, “ধুয়ে শুকিয়ে নিলে ব্যবহার করা যাবে?”

ভোঁদা গামছাটাকে দেখে বলল, “এটা প্রাচীন নিদর্শন হতে পারে। গ্রামীণ জলজ সভ্যতার চিহ্ন।”

হরিপদ কাকা বললেন, “না বাবু, ওটা আমারই গামছা। গত সপ্তাহে পড়ে গেছিল।”

দ্বিতীয় বার কাবুলের ছিপ কাঁপল। কাবুল ভয় পেয়ে ছিপ ছেড়ে দিল। ছিপ পুকুরে ভেসে গেল।হরিপদ কাকা বললেন, “ওই যে মাছ টানছে!”

কাবুল কাঁপা গলায় বলল, “তাহলে মাছটাই ছিপটা রাখুক। ওর বেশি দরকার।”

ফুলেশ্বরী কাকিমা বললেন, “রে বাবা, কলকেতার পোলা মাছ ধরতে এসে মাছরে দান করছে!”

এরপর আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো খালে। সেখানে ছোট ডিঙি নৌকা। হরিপদ কাকা বললেন, “এবার নৌকায় বসে খেপলা জাল দেখাব।”

ভোঁদা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আমি নৌকার কমান্ড নেব।”

আমি বললাম, “তুই নৌকায় উঠলে নৌকাই কমান্ড ছেড়ে দেবে।”

কিন্তু ভোঁদা উঠল। তারপর আমি, টিনটিন, কাবুল। নৌকা একটু দুলতেই কাবুল আমার কাঁধ ধরে বলল, “পাটলা, যদি ডুবে যাই, আমার লুচির স্মৃতি রক্ষা করিস।”

হরিপদ কাকা বললেন, “ভয় নাই। খাল অগভীর।”

ভোঁদা বলল, “আমরা কলকাতার ছেলে। ট্রাম, বাস, মেট্রো—সব সামলাই। নৌকা কিছুই নয়।”

ঠিক তখন নৌকা একটু কাত হলো। ভোঁদা “মা গো!” বলে হরিপদ কাকার গলা জড়িয়ে ধরল।হরিপদ কাকা বললেন, “ওরে বাবু, আমারে ছাড়ো। আমি না থাকলে তোদের কে বাঁচাইব?”

খালের মাঝামাঝি গিয়ে হরিপদ কাকা জাল ফেললেন। তারপর বললেন, “এবার তোমরা চুপচাপ বসে থাকো।”

ভোঁদা এবার সত্যিই চুপ। কিন্তু তার শরীর চুপ নয়। সে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে কখনো ডানে, কখনো বাঁয়ে হেলে পড়ছে। তার প্রতিটি হেলনে নৌকা এমনভাবে দুলছে যে টিনটিন চোখ বন্ধ করে গুণতে লাগল, “এক, দুই, তিন—সম্ভাব্য বিপর্যয়।”

কাবুল বলল, “আমি মাছ খাই, কিন্তু মাছের সঙ্গে থাকতে চাই না।”

হঠাৎ ভোঁদার পায়ের কাছে কিছু একটা লাফ দিল। একটা ছোট মাছ নৌকায় উঠে পড়েছে।ভোঁদা চেঁচিয়ে উঠল, “সাপ!”

সে লাফ দিল।নৌকা কাত হলো।আমি টিনটিনর ওপর, টিনটিন কাবুলের ওপর, কাবুল মাছের ওপর, আর ভোঁদা সরাসরি খালের কাদায়।

হরিপদ কাকা চেঁচিয়ে উঠলেন, “আস্তে! আস্তে! এই যে বাবু, দাঁড়াও!”

ভোঁদা কাদা থেকে উঠে দাঁড়াল। মাথা থেকে পা পর্যন্ত কাদামাখা। শুধু চোখ দুটো জ্বলছে।সে বলল, “আমি ইচ্ছা করেই নামলাম। জলস্তর পরীক্ষা।”

টিনটিন বলল, “তোর জলস্তর হাঁটুর নিচে। কিন্তু সম্মানস্তর কাদার নিচে।”

খালের ধারে দু-চারজন গ্রামবাসী জড়ো হয়েছে। এক বৃদ্ধ বললেন, “কলকেতার বাবু মাগুর মাছের মতো কাদায় ভালোই লাফায়।”

একটা ছোট ছেলে বলল, “দাদাভাই, আরেকবার পড়েন না!”

ভোঁদা বলল, “চুপ! বিজ্ঞানকে বিনোদন বানিও না।”

কিন্তু আসল বিপদ তখনও বাকি। খাল থেকে উঠে আমরা শুকোতে বসেছি। ফুলেশ্বরী কাকিমা খবর পেয়ে এলেন। হাতে মুড়ি, পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, নারকেল কুচি। তিনি বললেন, “মাছ ধরতে পারো নাই, কিন্তু পেট ধরার ব্যবস্থা করি।”

কাবুলের চোখ জ্বলে উঠল। সে এক মুঠো মুড়ি মুখে দিয়ে বলল, “এই গ্রাম অত্যন্ত উন্নত।”

ভোঁদা কাদামাখা অবস্থায়ও মর্যাদা রাখতে বলল, “আমাদের ব্যর্থতা আংশিক। আমরা জলজ জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে শারীরিক সংযোগ স্থাপন করেছি।”

ফুলেশ্বরী কাকিমা বললেন, “হ্যাঁ, কাদা তোকে আপন করে নিয়েছে।”

দুপুরে ঠিক হলো, বিকেলে আমরা পুকুরে নামব। এবার হাতজাল দিয়ে মাছ ধরা শেখানো হবে।কাবুল আপত্তি করল, “আমার কি পুকুরে নামতেই হবে? আমি তীরে বসে মাছদের নৈতিক সমর্থন দিতে পারি।”

ভোঁদা বলল, “না। দলগত অভিযান। সবাই নামবে।”

বিকেলে পুকুরের জল গরম। হাঁটু পর্যন্ত নেমে দাঁড়াতেই কাদা পায়ের আঙুলে ঢুকে গেল।আমি বললাম, “এই কাদা নড়ছে কেন?”

হরিপদ কাকা বললেন, “কাদা নড়ে না, তোমার পা কাঁপছে।”

টিনটিন বৈজ্ঞানিক ভঙ্গিতে বলল, “সিল্টি ক্লে সয়েল। উচ্চ আর্দ্রতা। নিম্ন স্থিতিশীলতা।”

ভোঁদা বলল, “বাংলায় বল।”

টিনটিন বলল, “কাদা। পিছল। পড়বি।”

প্রমাণ করতে দেরি হলো না। ভোঁদা হাতজাল নিয়ে সামনে এগোতেই পা পিছলে এমনভাবে বসে গেল যে পুকুরের জল গোল হয়ে উঠল। তার মাথায় শাপলা পাতা আটকে গেল।কাবুল বলল, “দেখ পাটলা, জলপরী নয়, জলপরেশ।”

ফুলেশ্বরী কাকিমা পাড় থেকে বললেন, “ও বাবু, মাথায় পাতা দিয়া সাধু সেজেছ?”

ভোঁদা উঠে বলল, “এটা স্থানীয় ছদ্মবেশ কৌশল।”

ঠিক তখন টিনটিনর পায়ের কাছে একটা কাঁকড়া এসে চিমটি কাটল।টিনটিন, যে সাধারণত নিউটনের সূত্র ছাড়া আর কিছুতে উত্তেজিত হয় না, সে এমন লাফ দিল যে তার চশমা পুকুরে পড়ে গেল।সে চেঁচিয়ে উঠল, “আমার অপটিক্যাল যন্ত্র!”

হরিপদ কাকা বললেন, “চশমা পরে মাছ ধরতে নামলে এই হয়।”

আমরা সবাই চশমা খুঁজতে লাগলাম। পাঁচ মিনিট পরে কাবুল কাদা থেকে চশমা তুলে বলল, “পেয়েছি!”

টিনটিন বলল, “ধন্যবাদ।”

কাবুল বলল, “কিন্তু একটা কাঁকড়া পরে আছে।”

সত্যিই, চশমার এক কাঁচের ওপর ছোট কাঁকড়া বসে আছে। টিনটিন কাঁপা গলায় বলল, “ওকে সরাও।”

ভোঁদা বলল, “ভয় পাস না। কাঁকড়া তোকে পড়াশোনা শেখার জন্য চশমা নিয়েছে।”

শেষ পর্যন্ত হরিপদ কাকা চশমা উদ্ধার করলেন। আমরা পুকুরে হাতজাল টানলাম। উঠে এল তিনটে পুঁটি, একটা শামুক, দুটো পাতা, আর একটা রহস্যময় বস্তু।কাবুল বলল, “এটা কি মাছ?”

হরিপদ বললেন, “ওটা নারকেলের খোলা।”

ভোঁদা গম্ভীরভাবে বলল, “সব আবিষ্কার প্রথমে রহস্যময়ই থাকে।”

সন্ধেবেলা গ্রামে খবর ছড়িয়ে গেল—কলকাতার চার ছোকরা মাছ ধরতে এসে গাছ ধরেছে, গামছা ধরেছে, কাদা ধরেছে, কাঁকড়া ধরেছে, কিন্তু মাছ তেমন ধরতে পারেনি।আমরা একটু লজ্জিত। বিশেষত ভোঁদা। সে উঠোনে বসে বলল, “আজকের দিনটা ছিল প্রস্তুতি। কাল আসল অভিযান।”

আমি বললাম, “কাল কি মাছদের আগে চিঠি দিয়ে জানাবি?”

কাবুল বলল, “না হলে মাছরা থাকবে না।”

টিনটিন বলল, “ডেটা অনুযায়ী আমাদের সফলতার হার কম।”

ভোঁদা বলল, “ডেটা কাপুরুষদের অস্ত্র।”

পরদিন ভোরে হরিপদ কাকা বললেন, “আজ শেষ চেষ্টা। বাঁশের ফাঁদ বসাইব। নাম ‘চাঁই’। মাছ নিজে ঢুকবে।”

ভোঁদা খুশি।“এই তো! মেধাভিত্তিক পদ্ধতি। মাছ নিজে আসবে। আমরা নেতৃত্ব দেব।”

চাঁই পুকুরের ধারে বসানো হলো। টোপ দেওয়া হলো। অপেক্ষা।এইবার আমরা দূরে বসে থাকলাম। ফুলেশ্বরী কাকিমা বললেন, “বাবুরা বেশি কাছে গেলে মাছও হাসতে হাসতে পালায়।”

এক ঘণ্টা পরে চাঁই তোলা হলো। ভিতরে সত্যিই মাছ! ছোট ছোট বেশ কয়েকটা পুঁটি আর একটা ট্যাংরা।কাবুল আনন্দে লাফিয়ে বলল, “আমরা জিতেছি!”

ভোঁদা বুক ফুলিয়ে বলল, “দেখলে? আমার নেতৃত্বে গ্রামীণ মৎস্য বিপ্লব।”

হরিপদ কাকা হেসে বললেন, “বিপ্লব চাঁই করেছে, তুমি না।”

ঠিক তখন বিপত্তি। ট্যাংরা মাছটা চাঁই থেকে লাফিয়ে ভোঁদার পায়ের কাছে পড়ল। ভোঁদা ভেবেছে আবার সাপ। সে পিছিয়ে গিয়ে একটা কলসিতে ধাক্কা খেল। কলসি উলটে গেল। জল গড়িয়ে উঠোন ভিজে গেল। ভোঁদা পিছলে গিয়ে সোজা বসে পড়ল হাঁড়িভর্তি ধোয়া চালের ওপর।ফুলেশ্বরী কাকিমা মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “হায় হায়, ভাতের আগে বাবু সিদ্ধ হইল!”

গ্রামের ছেলেরা হাততালি দিল। কাবুল হেসে এমন অবস্থায় গেল যে বসে পড়ল। টিনটিন বলল, “এটা সম্পূর্ণ গতিবিদ্যার সমস্যা। ঘর্ষণ কম, ভর বেশি, ফলাফল ধপাস।”

ভোঁদা চালমাখা শরীরে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “হাসছিস কেন? আমি খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে একাত্ম হলাম।”

ফুলেশ্বরী কাকিমা বললেন, “আগে গা ধুয়ে আয়। তারপর একাত্মতা করিস।”

সেদিন দুপুরে আমাদের ধরা মাছ দিয়ে ঝোল হলো। মাছ মোটে আটটা। কিন্তু ফুলেশ্বরী কাকিমা এমনভাবে রান্না করলেন যে কাবুল ঘোষণা করল, “এই আট মাছ আমার জীবনের আট অধ্যায়।”

ভোঁদা খাওয়ার সময় বলল, “আজ আমরা বুঝলাম, মাছ ধরা শুধু পেশা নয়, দর্শন।”

আমি বললাম, “আর কাদা?”

ভোঁদা বলল, “কাদা হচ্ছে জীবনের বাস্তবতা।”

টিনটিন বলল, “আর গামছা?”

ভোঁদা বলল, “ঐতিহাসিক দলিল।”

কাবুল বলল, “আর ভাত?”

ভোঁদা বলল, “জাতীয় সম্পদ।”

ফেরার দিন গ্রামের সবাই আমাদের বিদায় দিতে এল। হরিপদ কাকা বললেন, “আবার আইসো। তবে আগে একটু চুপ থাকা শিখে আইসো।”

ফুলেশ্বরী কাকিমা হাতে মুড়কি দিয়ে বললেন, “কলকেতায় গিয়ে কইও, মেদিনীপুরে মাছ কম, মজা বেশি।”

ভোঁদা গম্ভীরভাবে বলল, “আমরা এই অভিজ্ঞতা বই আকারে প্রকাশ করব। নাম—‘মৎস্যমানবের মহাযাত্রা’।”

আমি বললাম, “নামের নিচে লিখিস—‘গাছ থেকে গামছা: এক ব্যর্থ গবেষণা’।”

কাবুল বলল, “আর রেসিপি দিস।”

ট্রেন ছাড়ল। জানলার বাইরে মেদিনীপুরের সবুজ মাঠ পিছিয়ে যেতে লাগল। ভোঁদা নোটবুক খুলে শেষ লাইন লিখল—মাছ ধরা কঠিন। মাছ খাওয়া সহজ। তবে গ্রামের মানুষ সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

আমি চুপচাপ তার পাশে লিখে দিলাম—আর ভোঁদার কারণে মাছরাও এখন কলকাতাকে ভয় পায়।

 
 
 

Comments


রাঁচি, কলকাতা এবং ইম্ফালে আমাদের সাথে সংযোগ করুন

মুঠোফোন : ​ 8292385665;  মেইল: info@dcdt.net

  • s-facebook
  • Twitter Metallic
  • s-linkedin
bottom of page