দ্বিতীয় পর্ব: ব্যারাকপুরের টোটা ও বারুদের গন্ধ
- Development Connects

- Jul 6
- 14 min read

ঘোড়ার খুরের সেই বজ্রগর্ভ আওয়াজ যখন ভাগীরথীর তীরের কাদায় পিষে যাওয়া আমপাতার সুবাসকে ম্লান করে ধেয়ে আসছিল, তখন তা আচমকা এক তীব্র, ধাতব আর্তনাদে রূপ নিল—যা ঈশানীর হিপোক্যাম্পাসের পেছনে থাকা কোয়ান্টাম-মেমোরি ম্যাট্রিক্সের স্নায়ুপথে এক যান্ত্রিক হাহাকার জুড়ে দিয়েছিল। চোখের পলকে পুরো পরিপার্শ্বটা এক কালচে বেগুনী রঙের ঘূর্ণিতে তলিয়ে গেল, তারপর এক পলকের জন্য অন্ধ করে দেওয়া জীবাণুমুক্ত সাদা আলো, আর তার পরক্ষণেই তারা এসে আছাড় খেল এক দমবন্ধ করা, তপ্ত, ধূলিধূসর দুপুরের বুকে—যার বাতাসে মিশে ছিল শুকিয়ে যাওয়া ঘোড়ার মল, নদীর পলি আর পোড়া কাঠের এক আদিম ঝাঁঝালো গন্ধ।
তারা উনবিংশ শতাব্দীর মেঝেটা চিরে সরাসরি ইতিহাসের এক নতুন গর্ভে এসে পড়েছেন।
ভাঙা ইটের তৈরি এক পুরোনো মালির বাগান-ঘরের দেওয়ালের আড়ালে ঈশানী যখন আছাড় খেয়ে পড়লেন, তখন তাঁর বুক থেকে এক অবাধ্য আর্তনাদ ছিটকে বেরোল। তাঁর সেই কৃত্রিমভাবে তৈরি সুচারু বিধবার থান কাপড়টা সময়ের এই অতর্কিত ঝাঁকুনিতে বদলে গিয়ে এখন ধারণ করেছে এক মোটা, কোরা সুতির শাড়ি—যার ভাঁজে ভাঁজে নীল আর কাঠখড় পোড়া ধোঁয়ার গন্ধ। নিজের বুড়ো আঙুলের নিচে থাকা মাইক্রোফ্লুইডিক ওয়েদার নিডলটার ওপর তিনি চোখ রাখলেন; সেখানে তখন এক বিপদের ইঙ্গিতবাহী অম্বর মণি স্পন্দিত হচ্ছে।
বছরটি ১৮৫৭। স্থান—কলকাতা থেকে মাত্র চব্বিশ মাইল উত্তরে, ধূসর ও অলস ভাগীরথীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা বিখ্যাত ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট।
তাঁর ঠিক পাশেই, বুনো বিছুটি আর অপরাজিতা লতায় ছেয়ে যাওয়া একটা ভাঙা ইটের স্তূপের গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ঘনশ্যাম দত্ত-৯৭। পলাশীর সেই পাটনাই ব্যবসায়ীর ঢিলেঢালা জামাটা এখন উধাও। তাঁর পরনে এখন বেনারসের এক ভ্রাম্যমাণ অস্ত্র-মেরামতকারীর তৈলাক্ত, আলগা কোর্তা আর মাথায় এক বিচিত্র তেরছা পাগড়ি। ওপরে একজোড়া অবিশ্বাস্য গোঁফ এমন এক অহংকারের সাথে সেঁটে দেওয়া হয়েছে, যা দেখে মনে হয়—লোকটি চোখের পলকে একটা এনফিল্ড রাইফেল খুলে আবার জুড়ে দিতে পারে, কিন্তু বাড়ির মালিককে সময়মতো ভাড়া দেওয়ার কথা বললে তার স্মরণশক্তি লোপ পায়।
ঘনাদা দুপুরের সেই তপ্ত ধুলোমাখা বাতাসের মধ্যে এক দীর্ঘ, নাটুকে শ্বাস টেনে নিলেন। তাঁর চোখের পাতায় তখনও ব্যারাকপুরের লাল ধুলো জমছে। উত্তর কলকাতার কোনো এক মেস-বাড়ির তক্তপোশে বসে চা নাড়তে নাড়তে আড্ডা মারার সেই চেনা, অলস ভঙ্গিতেই তিনি ফিসফিস করে উঠলেন, "আহা, ডক্টর সেন! গন্ধটা পাচ্ছেন? একটা গোটা সাম্রাজ্যের খেরোখাতা যখন তলা থেকে পচতে শুরু করে, তখন ঠিক এইরকম একটা সুবাস বেরোয়! খাসা, তাই না?"
"গলাটা একটু নামান, ঘনাদা," ঈশানী দাঁতে দাঁত চাপলেন। তাঁর বাম ভ্রু জোড়া কুঁচকে উঠল এবং চোখের ভেতরের ভিজ্যুয়াল রিকগনিশন ইমপ্ল্যান্টটি বাতাসে এক ম্লান নীল রঙের সম্ভাবনার ছক বিছিয়ে দিল। "পুরো ছাউনিটা একটা বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ব্যুরোর হিসাব যদি আধ সেকেন্ডের জন্যও ভুল হয়, তবে আমরা সোজা ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে গিয়ে দাঁড়াবো।"
ভাঙা দেওয়ালের ফাটল দিয়ে ব্যারাকপুরের সেই মহাকাব্যিক আর করুণ রণক্ষেত্রটা তাঁদের চোখের সামনে ফুটে উঠল। মাথার ওপর গনগনে সূর্যটা যেন কোনো দয়া-মায়ার ধার ধারে না, আর তার নিচেই ধুধু করছে হলদে ধুলোর এক বিশাল প্যারেড গ্রাউন্ড। দূরে বটের প্রাচীন ও ঘন সবুজের বুক চিরে সাহেবদের সাদা রঙের বাংলোগুলো সারিবদ্ধ দাঁতের মতো দাঁড়িয়ে। কিন্তু দুপুরের এই নিস্তব্ধতা ছিল বড্ড ঠুনকো, ঠিক যেন কাচের তৈরি। কোয়ার্টার-গার্ডের ছাউনির ওপার থেকে একটা বিউগলের আওয়াজ ভেসে আসছিল—ঠিক যেন এক তামার বাসনে আটকে পড়া মশার ভনভনানি।
"ইতিহাসের চিত্রনাট্য চালু হয়ে গেছে, ঘনাদা," ঈশানী ফিসফিস করে সিপাহীদের লাইনের দিকে নির্দেশ করলেন।
সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল এক দীর্ঘদেহী, ছিপছিপে জোয়ান। বিগত কয়েক রাতের অনিদ্রা আর ধুলোয় তার ধবধবে সাদা উর্দিটা মলিন। পাগড়িটা বিন্যস্ত নয়, আর চোখ দুটো জ্বলছে এক পবিত্র, ভয়ংকর উন্মাদের মতো—যা দেখে মনে হয় না যে সে কোনো রাজনৈতিক বিদ্রোহের হিসাব কষছে, বরং মনে হয় সে সরাসরি সূর্যের চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের চোখের পলক ফেলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। তাঁর ডান হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে আছে একটা পালিশ করা এনফিল্ড রাইফেলের কুঁদো।
মঙ্গল পাণ্ডে।
"ঠিক চৌত্রিশ মিনিটের মধ্যে," ঈশানী নিজের মনের ভেতরের কোয়ান্টাম ম্যাট্রিক্সের হিসাব মিলিয়ে বললেন, "উনি এই মাঠের মাঝখানে এসে দাঁড়াবেন। চৌত্রিশ নম্বর বেঙ্গল নেটিভ ইনফ্যান্ট্রিকে ওই চর্বি মাখানো টোটার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার ডাক দেবেন। সার্জেন্ট মেজর হিউসনের ওপর গুলি চালাবেন এবং গুলিটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে। তারপর নিজের ওপর বন্দুক চালাবেন, কিন্তু মরবেন না; একটা সামরিক আদালতের মুখোমুখি হয়ে আগামী আটই এপ্রিল ওঁর ফাঁসি হবে। বড্ড অগোছালো, রক্তাক্ত আর নোংরা এক স্ফুলিঙ্গ—কিন্তু এই স্ফুলিঙ্গ ছাড়া এই উপমহাদেশের অবদমিত স্মৃতির বারুদে আগুন লাগত না। উনি যদি আজ না ঝুলতেন, তবে মীরাটের সেই মহাবিদ্রোহের জন্ম হতো না। আর মীরাট না থাকলে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৯৪০ সাল পর্যন্ত এ দেশের বুকে বুক ফুলিয়ে রাজত্ব করত। আমাদের সেই তেইশ শতকের ভবিষ্যৎটা তখন স্রেফ একটা কর্পোরেট কোম্পানির খাতায় পরিণত হতো—যেখানে মানুষের ইতিহাস মাপা হতো কেবল বার্ষিক লভ্যাংশের নিরিখে।"

"বড্ড বেরসিক ভবিষ্যৎ," ঘনাদা একমত হলেন এবং নিজের হাতের তালুর মধ্যে একটা শুকনো পাতা পিষতে পিষতে বললেন, "ইতিহাস হলো আসলে একটা উপন্যাসের মতো—তার ট্রাজিক নায়কদের বড্ড খামখেয়ালী আর ত্রুটিপূর্ণ হতে হয়, এমন এক অহংকারে চালিত হতে হয় যার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই, এমন এক গুজবের ওপর ভর করে ঝাঁপাতে হয় যা তারা নিজেরা যাচাই করেনি। সিপাহীদের যদি বড্ড বেশি বুদ্ধিমান করে তোলেন, তবে গল্পটা আর এক পা-ও সামনে এগোবে না। কিন্তু ওই ছাদের দিকে তাকান, ডক্টর সেন। মনে হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যতের বন্ধুরা একটু বেশি গোছানো গল্প পছন্দ করে।"
ঈশানীর দৃষ্টি ঘনাদার আঙুলের নির্দেশ ধরে অস্ত্রাগারের কেন্দ্রীয় ভবনের লাল ইটের ছাদের দিকে চলে গেল। তাঁর চোখের ভেতরের ওভারলে স্ক্রিনটা মুহূর্তের মধ্যে এক সতর্ককারী লাল আলোয় দপ করে উঠল।
ছাদের সেই আলিসা বা প্যারাপেটের আড়ালে এক ছায়ামূর্তি শুয়ে আছে। তার পরনে সিপাহীদের শিবিরের সাধারণ এক অনুচরের খাকি পোশাক হলেও হাতের অস্ত্রটা এই শতাব্দীর নয়। একটা লম্বা, ছিপছিপে রাইফেল—যার নলের ওপর টাইম অ্যালয়ের সেই অদ্ভুত নীলচে আভা ঝলকাচ্ছে—যা দিয়ে কোনো শব্দ ছাড়াই ঘনীভূত গতিশক্তির ডার্ট ছোঁড়া যায়।
"এক ক্রনোপ্যাজ স্নাইপার!" ঈশানী দাঁতে দাঁত চাপলেন। তাঁর বুকের ভেতরের হৃৎপিণ্ডটা এক খুব সাধারণ মানুষের মতোই চিল চিৎকার জুড়ে দিল। "ওরা মঙ্গল পাণ্ডেকে খুন করতে আসেনি।"
"না," ঘনাদা তাঁর ধারালো চোখ দুটো আরও সরু করে বললেন—ঠিক যেমন সুন্দরবনের জঙ্গলে কোনো দুষ্প্রাপ্য পশুর পায়ের ছাপ খোঁজেন এক পোড়খাওয়া শিকারী। "ওরা বড্ড চতুর। মঙ্গলকে খুন করলে ও সময়ের আগেই শহীদ হয়ে যাবে। কিন্তু ওরা যদি তিনশো গজ দূর থেকে ওঁর রাইফেলের ওই লক-প্লেটটা উড়িয়ে দেয়, তবে ও ঘোড়া টেপার আগেই বন্দুকটা জ্যাম হয়ে যাবে। ব্যস, ওঁর নিজের সঙ্গীরাই ওঁকে এক আফিমখোর মাতাল ভেবে টেনে-হিঁচড়ে ব্যারাকে নিয়ে চলে যাবে। কোনো নাটকীয় প্রতিবাদ হবে না, প্যারেড গ্রাউন্ডে রক্ত ঝরবে না, আর কলকাতার বাজারে গাইয়েদের গান বাঁধার মতো কোনো প্রতীক তৈরি হবে না। একটা সামান্য অপমানের কাদায় ইতিহাসের সেই মহাজাগতিক আগুনটা নিভে যাবে।"
"আমাদের ওই স্নাইপারকে থামাতে হবে, ঘনাদা," ঈশানী তাঁর বাঁ হাতের রিড-ব্রেসলেটের ওপর আঙুল রাখলেন। ব্যুরোর কড়া নিয়মের কারণে ওটার ভেতরে লুকানো আছে এক সামান্য গ্রাফিন পালস ফিলামেন্ট—যা স্রেফ একটা মৃদু ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গের কাশির মতো ঝাঁকুনি দিতে পারে। "কিন্তু এই নিচু নর্দমা থেকে আমি সোজা নিশানা পাচ্ছি না। ছাদটা বড্ড উঁচুতে।"
ঘনাদা তাঁর সেই ভাঙা গোঁফে হাত বুলিয়ে এক চিলতে হাসলেন। "তার জন্য ভাববেন না, ডক্টর সেন। পামির মালভূমিতে যখন একজোড়া সাদা চিতা তাড়া করেছিলুম—হাতে স্রেফ একটা পুরোনো ঠাসাকল আর পকেটে একমুঠো ভাজা ছোলা—তখনই বুঝেছিলুম যে প্রতিটা ছাদেরই একটা করে অনাহূত অতিথি থাকে। আপনি এখানে থাকুন আর ছেলেটার ওপর নজর রাখুন। আমি একটু ছাদের ওই ভবিষ্যতের বাবাজির সাথে মোলাকাত করে আসি।"
পামির মালভূমিতে যে কোনো সাদা চিতা থাকে না, ঈশানী সে কথা মনে করিয়ে দেওয়ার আগেই ঘনাদা সেই পরিত্যক্ত বাগানের ঝোপঝাড়ের আড়ালে এক মায়ার মতো মিলিয়ে গেলেন—যাঁর নড়াচড়ার মধ্যে এমন এক ক্ষিপ্রতা ছিল যা স্রেফ নিজের দেনাদারদের হাত থেকে বাঁচার জন্য কলকাতার অলিগলিতে দৌড়ে বেড়ানো এক যাযাবরের পক্ষেই সম্ভব।
দুপুরের সেই তপ্ত বাতাসে একা দাঁড়িয়ে ঈশানী আবার সিপাহীদের লাইনের দিকে তাকালেন। চারপাশের বাতাসটা ক্রমশ ভারী হয়ে আসছিল, যাতে মিশে ছিল দুপুরের রান্নার কাঠকয়লার ধোঁয়া আর সর্ষের তেলের কড়া গন্ধ। আচমকা তাঁর চোখের ভেতরের ইমপ্ল্যান্ট স্ক্রিনটা আবার কেঁপে উঠল—সম্ভাবনার সেই সোনালি ছকের ভেতর এক সম্পূর্ণ নতুন লাল সুতোর অনুপ্রবেশ ঘটেছে, যা আস্তাবলের দিক থেকে ধেয়ে আসছে।
একটা তরুণ সিপাহী, তার মুখ দিয়ে ঘাম ঝরছে, সে দুই হাত তুলে মঙ্গল পাণ্ডের দিকে উন্মাদের মতো দৌড়ে আসছে। তার হাতে কোনো অস্ত্র নেই; তার ভঙ্গিটা এক মরিয়া, আর্ত অনুনয়ের।
"মঙ্গল ভাই! থামো!" তরুণের গলার আওয়াজ ধুলোমাখা মাঠের ওপর দিয়ে ভেসে এল, যাতে কাঁপছিল এক খাঁটি, বুকচেরা মানবিক আতঙ্ক। "দোহাই ধর্মাবতার, বন্দুকটা নামিয়ে নাও! দমদম থেকে ওরা ঘোড়সোওয়ার কামান নিয়ে আসছে! স্রেফ একটা ভুলের জন্য ওরা তোমাকে কামানের মুখে বেঁধে উড়িয়ে দেবে!"
ঈশানীর স্নায়ুতন্ত্রের মেমোরি ব্যাংক মুহূর্তের মধ্যে চিৎকার করে উঠল—অ্যানোমালি! ব্যতিক্রম!

মূল ইতিহাসে, কৃষ্ণনগরের এই সিপাহীটির—যার নাম হরেন চন্দ্র পাল—আজকের দিনে ব্যারাকে কলেরায় ভুগে মরে থাকার কথা ছিল। সূর্যাস্তের আগেই তার নামটা কোম্পানির এক খেরোখাতায় উঠে যাওয়ার কথা ছিল চিরকালের মতো হারিয়ে যাওয়া এক সংখ্যা হিসেবে। কিন্তু কেউ একজন মাঝপথে হাত গলিয়েছে। কোনো এক ক্রনোপ্যাজ দালাল আজ সকালে হাসপাতালের লাইনে ঢুকে ওকে তেইশ শতকের রিহাইড্রেশন ন্যানো-মেডিসিন খাইয়ে চাঙ্গা করে তুলেছে। আর এখন, হরেনের সেই অবাধ্য ভাইয়ের ভালোবাসাটাই ইতিহাসকে ওলটপালট করতে চলেছে।
হরেন যদি আজ মঙ্গল পাণ্ডেকে বুঝিয়ে মাঠ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, তবে ইতিহাসের এই রেশমের সুতোটা কাদার মধ্যে ছিঁড়ে যাবে।
ঈশানী তখন ব্যুরোর কোনো নিয়মের কথা ভাবলেন না। দাবার গ্র্যান্ডমাস্টারদের লজিক বা যুক্তিবাদের সেই ঠান্ডা অনুশাসন তাঁর মাথা থেকে উধাও হয়ে গেল। তাঁর মজ্জার ভেতরে জেগে উঠল উনিশ শতকের সেই বাংলার নবজাগরণের তেজ আর জিদ।
তিনি সোজা সেই ভাঙা কনজারভেটরির আড়াল থেকে বেরিয়ে হরেন পালের পথ আটকে দাঁড়ালেন।
তরুণ সিপাহীটি প্রায় ওঁর গায়ে এসে ধাক্কা খাচ্ছিল, শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে এক কর্কশ গালমন্দ করে উঠল সে। এই ভর দুপুরে মিলিটারি ক্যান্টনমেন্টের মাঝখানে এক অচেনা ব্রাহ্মণ বিধবাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার চোখ দুটো বিস্ময়ে আর গুলিয়ে যাওয়া বুদ্ধিতে চওড়া হয়ে উঠল।
"সরে যাও, মা!" হরেন হাঁপাতে হাঁপাতে ওঁকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। "এটা মেয়েমানুষের জায়গা নয়। কয়েক মিনিটের মধ্যে এই ঘাসের ওপর রক্ত গঙ্গার বন্যা বয়ে যাবে।"
"আর সেই রক্তটা কার হবে, হরেন?" ঈশানীর গলার আওয়াজটা দুপুরের নিস্তব্ধতায় এক শুকনো ডালের মতো মট করে ভেঙে পড়ল। তিনি ওঁর আসল নামটা ধরেই ডাকলেন—যাতে ছিল কোনো এক জমিদারের অন্দরমহলের বয়স্কা কর্ত্রীর মতো এক ধারালো অধিকার, যিনি জানেন যে ওঁর বাড়ির ছেলেরা কখন কী পাপ করেছে।
হরেন থমকে গেল, তার বুট জোড়া ধুলোর ওপর এক অনড় পাথরের মতো আটকে গেল। "তুমি... তুমি আমার নাম কী করে জানলে, মা?"
"কৃষ্ণনগরের যে ছেলেরা দক্ষিণা বাতাস বইলেই নিজেদের জাত আর ধর্ম ভুলে যায়, আমি তাদের সবার নাম জানি," ঈশানী আরও একধাপ এগিয়ে গেলেন, ওঁর চোখের সেই কালো মণির তীব্রতা হরেনকে কাঁপিয়ে দিল। "তুমি ভাবছ তুমি ওকে বাঁচাতে যাচ্ছ, তাই না? তুমি ভাবছ ও যদি আজ বন্দুকটা নামিয়ে নেয়, তবে ও আবার নিজের গাঁয়ে ফিরে যাবে, বাপের হাল ধরবে আর পুকুরধারে এক বুড়ো মানুষ হয়ে শান্তিতে মরবে?"
"ও আমার ভাই," হরেন ফিসফিস করে বলল, তার চোখের কোণে তখন এক অদ্ভুত লজ্জা আর ভয়। "ও যদি আজ ওই গুলিটা চালায়, তবে ওরা ওকে ওই মস্ত বটগাছটায় ঝুলিয়ে দেবে।"
"হ্যাঁ," ঈশানী বললেন, ওঁর কণ্ঠস্বর তখন এক পরম সুন্দর কিন্তু মারাত্মক ফিসফিসানিতে রূপ নিয়েছে—যা ছাদের ওপরের স্নাইপার রাইফেলের চেয়েও বেশি ধারালো। "ও ঝুলবে। কিন্তু ওঁর ওই ফাঁসির দড়িটাই হবে একটা হাতুড়ি—যা কলকাতা থেকে দিল্লি পর্যন্ত প্রতিটা কারাগারের শিকল ভেঙে চুরমার করে দেবে। আর তুমি যদি আজ ওকে আটকাও, হরেন, তবে তুমি ওর প্রাণ বাঁচাবে না। তুমি শুধু নিশ্চিত করবে যে আজ থেকে কুড়ি বছর পর কোনো এক সস্তা মদের দোকানে ও এক অজ্ঞাতপরিচয় মাতাল হয়ে মরবে—যাঁর লাশের ওপর মাছি ছাড়া কাঁদার মতো আর কেউ থাকবে না। ওই লোকটার দিকে তাকাও। ওকে দেখে কি মনে হয় যে ও কোনো কাপুরুষের হাতে নিজের জীবন ভিক্ষা চায়?"
ধুলোর আস্তরণ ভেদ করে মঙ্গল পাণ্ডে ততক্ষণে কোয়ার্টার-গার্ডের দিকে এগোতে শুরু করেছেন, ওঁর গলার আওয়াজ ক্যান্টনমেন্টের বাতাসে এক আদিম রুদ্র-স্তোত্রের মতো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
হরেন একবার ওঁর বন্ধুর দিকে তাকাল, আর একবার তাকাল ঈশানীর দিকে। তার মুখাবয়বে তখন ফুটে উঠছিল মানুষের মনের সমস্ত আদিম দ্বন্দ্ব—ভয়, ভালোবাসা, লজ্জা আর সেই আকস্মিক, অদ্ভুত এক আত্মমর্যাদা—যা প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্পের কোনো অতি সাধারণ মানুষের ভেতরেও জেগে ওঠে যখন চারপাশের পৃথিবীটা বড্ড বেশি নিষ্ঠুর হয়ে দাঁড়ায়। সে ধীরে ধীরে দু-পা পিছিয়ে গেল, তার হাত দুটো শরীরের পাশে ঝুলে পড়ল।
"ভগবান আমাদের ক্ষমা করুন," হরেন ফিসফিস করে উঠল, তার গলাটা বুজে আসছিল। "আমরা একটা জ্যান্ত মানুষকে আগুনের মুখে হেঁটে যেতে দিচ্ছি।"
"আগুনটা তো আগেই লেগে গেছে, হরেন," ঈশানী মৃদুস্বরে বললেন, ওঁর নিজের বুকের ভেতরটা ওই ছেলেটার জন্য কঁকিয়ে উঠলেও নিজের ছদ্মবেশটা তিনি অটল রাখলেন। "আমরা শুধু নিশ্চিত করছি যেন আগুনটা ভুল বাড়ি পুড়িয়ে ছাই না করে দেয়।"
ঠিক তখনই মাথার ওপর, অস্ত্রাগারের সেই তপ্ত লাল ইটের চালের ওপর, ভবিষ্যতের দখল নেওয়ার যুদ্ধটা চলছিল অনেক কম গাম্ভীর্যের সাথে, কিন্তু অনেক বেশি কাদার মিশ্রণে।
ক্রনোপ্যাজ স্নাইপারটি যখন ওঁর উইন্ডেজ ডায়ালটা ঘুরিয়ে মঙ্গল পাণ্ডের বন্দুকের ওপর শেষ নিশানা সাধছে, ঠিক তখনই একটা ভারী, পোড়া মবিলের গন্ধমাখা হাত ওঁর রাইফেলের নলের ওপর এসে চেপে বসল—ঠিক যেন কোনো এক গ্রামীণ কামারের নেহাইয়ের সাঁড়াশি!
"খাসা জিনিস বানিয়েছেন তো মশাই!" ঘনাদা বটের এক প্রকাণ্ড ঝুলন্ত ডালের ছায়া থেকে চালের ওপর নেমে এসে দাঁত বের করে হাসলেন। "তবে ব্যালেন্সটা একটু সামনের দিকে বেশি ভারী ঠেকছে। আর এই নীল রঙের ফিনিশিংটা দুপুরের রোদ্দুরে বড্ড সস্তা দেখাচ্ছে। ৪২-এর সেই কনকনে শীতে, আসামের এক চা-বাগানে যখন একদল বর্মী দস্যুর মুখোমুখি হয়েছিলুম, তখন আমাদের হাতে ছিল স্রেফ একটা পিতল-বাঁধানো গাদাবন্দুক। আঃ, ওটার একটা আলাদা প্রাণ ছিল মশাই!"
স্নাইপারটি কোনো কথার উত্তর দিল না। যে সিন্থেটিকের শরীরের মাংসগুলো স্রেফ যান্ত্রিক সার্কিট ঢাকবার জন্য ব্যবহার করা হয়, তারা গল্পগাছার রস কোনোদিনই বোঝে না। সে এক প্রচণ্ড হাইড্রোলিক গতিতে রাইফেলটা ওপরের দিকে ঘোরাল, যাতে ওটার কুঁদোর এক ঘায়ে ঘনাদার চোয়ালটা গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়।
ঘনাদা ঠিক সেইভাবে মাথাটা সরিয়ে নিলেন, যেভাবে কলকাতার চিৎপুরের গলিতে দেনাদারদের লাঠির তাড়া খেলে তিনি মাথা নিচু করে পালাতেন। রাইফেলের কুঁদোটা ছাদের কার্নিশে গিয়ে আছাড় খেল, আর একঝাঁক লাল ইটের ধুলো আর পুরোনো চুন-বালি আকাশে উড়ে গেল। একটা ছোট রক্তচোষা গিরগিটি, যার পূর্বপুরুষরা তিনটি সাম্রাজ্যের পতন দেখেও স্রেফ নিরপেক্ষ থেকে বেঁচে গেছে, সে এক অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় ছাদের ফাটল দিয়ে নিচে নেমে গেল।
"একদম ভদ্রতাবোধ নেই," ঘনাদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন এবং নিজের বেনারসি ঝোলা থেকে একখানা ভারী, লোহার স্প্যানার বের করলেন—যা ১৮৪৫ সালে শেফিল্ডের কোনো এক কারখানায় তৈরি হয়েছিল। "চলুন দেখি, আপনার ওই তেইশ শতকের সার্কিট আমাদের এই শিল্পবিপ্লবের লোহার ধাক্কা কতটা সইতে পারে!"
স্নাইপারটি উঠে দাঁড়াল, তার চোখ দুটো কাচের মার্বেলের মতো অসাড় আর ভাবলেশহীন। সে তার কোমর থেকে একটা ছোট, বাঁকানো ছুরি বের করল। ওটা ইস্পাতের নয়; সংকুচিত সময়-কাঁচের তৈরি, যা থেকে এক হিমশীতল, স্বচ্ছ আলো বেরোচ্ছিল এবং চারপাশের দুপুরের ছায়াগুলোকে যেন গ্রাস করছিল। সে ঘনাদার দিকে এক অবিশ্বাস্য গতিতে লঙ মারল।
ঘনাদা নিজের লোহার স্প্যানার উঁচিয়ে পিছিয়ে গেলেন, কিন্তু সেই সময়-কাঁচের ছুরির ডগাটা ওঁর আলগা কোর্তার বাম হাতায় সামান্য ছোঁয়া দিয়ে গেল। কোনো কাপড় ছেঁড়ার শব্দ হলো না। পরিবর্তে, কোর্তার সেই বাম হাতাটা মুহূর্তের মধ্যে এই মহাবিশ্ব থেকে উধাও হয়ে গেল—যেন ওই সুতোগুলো এই পৃথিবীতে কোনোদিন জন্মাতেই রাজি হয়নি!

"আরে, এ তো ভারী অন্যায় মশাই!" ঘনাদা নিজের সেই হাসিখুশি ভাবটা এক পলকের জন্য ঝেড়ে ফেলে ওঁর ভেতরের পোড়খাওয়া যাযাবরের রূপটা বের করলেন। "একদম নতুন জামাটা ফাঁক করে দিলেন ভায়া! হাটখোলার দর্জিটা এবার আমার ওপর আগুন হয়ে যাবে।"
নিচে তখন প্যারেড গ্রাউন্ডের ধুলোর মধ্যে ইতিহাসের সেই চেনা ঘড়িটা তার শেষ সেকেন্ডে এসে ঠেকেছে।
মঙ্গল পাণ্ডে মাঠের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছেন। ওঁর গলার আওয়াজ পুরো ক্যান্টনমেন্টকে কাঁপিয়ে দিল। সার্জেন্ট মেজর হিউসন তাঁর ঘোড়া ছুটিয়ে তলোয়ার উঁচিয়ে এগিয়ে আসছেন—তাঁর মুখটা এক রাগী সাহেবের মতো লাল, যিনি বুঝতে পেরেছেন যে ওঁর পায়ের তলা থেকে কার্পেটটা টান মেরে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ছাদের স্নাইপারটি ঘনাদাকে উপেক্ষা করে আবার ওঁর রাইফেলটা প্যারাপেটের ওপর রাখল, যাতে মঙ্গল পাণ্ডের বন্দুকের ওপর একটা মরিয়া গুলি চালানো যায়।
"ঈশানী! এখনই!" ঘনাদা চিৎকার করে উঠলেন এবং একটা পুরোনো তোষক যেভাবে ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়, ঠিক সেইভাবে নিজেকে ওই সিন্থেটিকের পায়ের ওপর ছুঁড়ে দিলেন।
নিচে দাঁড়িয়ে ঈশানী আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলেন না। তিনি এক ঝটকায় নিজের হাতের ব্রেসলেটটা ছিঁড়ে ফেললেন।
বাতাসে একটা তীক্ষ্ণ, কান ফাটানো স্ট্যাটিক ইলেকট্রিসিটির শব্দ হলো, যার স্বাদ ঠিক যেন মুখে রাখা এক তামার পয়সা। ছাদের ওপরে স্নাইপার রাইফেলটা থেকে এক চিলতে নীল ধোঁয়া বেরোল, আর ওঁর ভেতরের কম্পিউটারের সার্কিটটা সেই ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পালসের ধাক্কায় জ্বলে গেল। ওঁর হাতের সেই অদৃশ্য ডার্টটি এক ফুট পাশ দিয়ে গিয়ে মঙ্গল পাণ্ডের পায়ের কাছে ধুলোয় আছাড় খেল।
ধুলো উড়ে গেল আকাশে। মঙ্গল পাণ্ডে মাথা ঘোরালেন, ওঁর চোখ দুটো চকচক করে উঠল যখন তিনি দেখলেন সাহেব ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে। তিনি নিজের এনফিল্ডটা উঁচিয়ে ধরলেন।
দুম!

বন্দুকের নল থেকে কালো বারুদের এক মস্ত ধোঁয়া বেরোল—যাতে মিশে ছিল পচা ডিমের গন্ধ আর এক দেশের মুক্তির স্বাদ। গুলিটা হিউসনকে লাগল না, লাগল ওঁর ঘোড়ার কাঁধে। ঘোড়া আর সওয়ার দুজনেই এক সাথে ছিটকে পড়ল প্যারেড গ্রাউন্ডের হলদে ধুলোর ওপর। আর ঠিক সেই মুহূর্তে সিপাহীদের ব্যারেক থেকে এক আদিম, বুনো চিৎকার আকাশ চিরে দিল—যাতে ছিল ভয়, বিস্ময় আর এক আকস্মিক জাগরণের সুর।
বারুদের স্তূপে আগুন লেগে গেছে।
ছাদের ওপর স্নাইপারটি বুঝতে পারল যে ওঁর মূল মিশনটা ব্যর্থ হয়েছে। ওঁর মুখে কোনো অনুশোচনা বা রাগের প্রকাশ না থাকলেও ওঁর যান্ত্রিক আঙুলগুলো সেই সময়-কাঁচের ছুরিটাকে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। সে ঘনাদার গ্রিপ থেকে নিজেকে এক ঝটকায় মুক্ত করল এবং ছাদ থেকে সরাসরি নিচের সিপাহীদের ভিড়ের মধ্যে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য পা বাড়াল, যাতে নিজের হাতেই বাকি কাজটা শেষ করতে পারে।
"আরে, অত তাড়া কিসের ভায়া!" ঘনাদা হাঁপাতে হাঁপাতে ওঁর সেই খুলে যাওয়া পাগড়ির কাপড়টা এক মস্ত সাদা পতাকার মতো উড়িয়ে দিলেন এবং পিছন থেকে স্নাইপারের খাকি কোর্তাটা খপ করে চেপে ধরলেন।
দুজনে একসাথে ছাদের কার্নিশ থেকে ওলটপালট খেয়ে নিচে পড়ে গেলেন, বটের প্রাচীন ঝোড়ো ডালগুলোর ধাক্কা সামলে তারা সোজা গিয়ে আছাড় খেলেন অস্ত্রাগারের পেছনের এক পাথরে বাঁধানো গভীর নর্দমার গর্তে।
পড়ার চোটেই স্নাইপারের হাত থেকে সেই সময়-কাঁচের ছুরিটা ছিটকে গিয়ে একটা কচি নিমগাছের গুঁড়িতে বিঁধল। এক পলকের জন্য সেই নিমগাছের তিনটে ভবিষ্যতের ডাল—যা হয়তো ১৮৯০ সালের কোনো এক তপ্ত দুপুরে ছোট ছোট বাচ্চাদের ছায়া দিত—তা চিরকালের জন্য এই সম্ভাবনা থেকে উধাও হয়ে গেল। মাঠের মধ্যে থাকা কোনো মানুষের চোখ সেদিকে গেল না।
ঈশানী নিজের শাড়ির আঁচলটা কুঁচকে ধরে সেই নর্দমার দিকে দৌড়ে গেলেন, ওঁর বুকের ভেতরের হৃৎপিণ্ডটা তখনও কামারের নেহাইয়ের মতো পিটছে। নর্দমার পাড়ে যখন তিনি পৌঁছালেন, তখন দেখলেন ঘনাদা তিন ইঞ্চি জমে থাকা নোংরা জল আর পচা পাতার মাঝখানে সোজা হয়ে বসে আছেন এবং নিজের একটা ছড়ে যাওয়া কনুই থেকে ধুলো ঝাড়ছেন বড্ড বিরক্ত মুখে। ওঁর ঠিক পাশেই শুয়ে ছিল সেই সিন্থেটিক স্নাইপার—ওঁর পোর্সেলিনের মতো মুখটা ফেটে গিয়ে ভেতর থেকে রুপোলি তার আর একটা সবুজ রঙের তরল চুইয়ে বেরোচ্ছিল, যা এই উনবিংশ শতাব্দীর বুকে বড্ড বেমানান।
"খতম," ঘনাদা এক মুখ ব্যারাকপুরের ধুলো থুথু করে ফেলে দিয়ে বললেন, "বড্ড কমজোরি মাল মশাই! একটু ধস্তাধস্তি করার দম নেই। কিন্তু ডক্টর সেন, মনে হচ্ছে আমাদের সামনে আর একটা নতুন মুশকিল এসে হাজির হয়েছে।"
প্যাড়েড গ্রাউন্ডের সেই ঘন ধোঁয়ার মাঝখানে তখন বিশৃঙ্খলা তার চরম সীমায় পৌঁছেছে। মঙ্গল পাণ্ডে ততক্ষণে নিজেকে শেষ করার জন্য রাইফেলের নলটা নিজের বুকের দিকে ঘুরিয়েছেন। ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে যে ওঁর এই আত্মহত্যার চেষ্টাও ব্যর্থ হবে—তিনি আহত হবেন কিন্তু বেঁচে থাকবেন, যাতে ওঁর ফাঁসি হতে পারে।
কিন্তু নর্দমায় পড়ে থাকা ওই মরণাপন্ন সিন্থেটিকটি ওঁর শেষ চালটা খেলে দিয়ে গেছে।
গার্ডের ঘরের পাশে রাখা টোটার মাটির বাক্সগুলোর একটা এই হুলস্থুলের চটে ভেঙে পড়েছিল। কাগজের প্যাকেটগুলো ফেটে গিয়ে ধূসর-কালো বারুদ ঘাসের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। আর এক পলায়নপর অনুচরের পায়ের ধাক্কায় সিপাহীদের উনুন থেকে একটা জ্বলন্ত কয়লার টুকরো ধুলো ভেঙে সোজা গড়িয়ে যাচ্ছে সেই বারুদের লাইনের দিকে। ওটা যদি এখন বারুদ ছুঁয়ে ফেলে, তবে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণে মঙ্গল পাণ্ডে ওখানেই ছিন্নভিন্ন হয়ে মারা যাবেন—কোর্ট-মার্শাল হওয়ার অনেক আগেই। কোনো অফিশিয়াল বিচার হবে না, সাহেবদের মনে সেই দীর্ঘস্থায়ী ভয়ের জন্ম হবে না—বিদ্রোহের পুরো সুরটাই বদলে যাবে।
ঈশানী দেখলেন সেই কয়লা গড়াচ্ছে। কিন্তু তিনি বড্ড দূরে ছিলেন।
কিন্তু হরেন পাল ওখানেই ছিল।
কৃষ্ণনগরের সেই ছেলেটা কোনো টাইমলাইনের হিসাব জানত না। সে জানত না টাইম ব্যুরোর কথা বা তেইশ শতকের সেই লভ্যাংশের ভবিষ্যতের কথা। সে শুধু জানত যে ওই অদ্ভুত বিধবা মা ওকে বলেছিলেন—মৃত্যু সবারই হয়, কিন্তু ইতিহাস শুধু তাদেরই মনে রাখে যারা নিজের মাটিতে অনড় দাঁড়িয়ে থাকে।

এক তীব্র, বুনো চিৎকার করে হরেন সামনের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল, তার ভারি চামড়ার বুট জোড়া দিয়ে সে সেই জ্বলন্ত কয়লার টুকরোটাকে কুয়োর পাড়ের কাদার মধ্যে চেপে দিল চিরকালের মতো।
বারুদে আগুন লাগল না।
তার ঠিক এক সেকেন্ড পরেই মঙ্গল পাণ্ডের বন্দুকটা ওঁর নিজের বুকের পাঁজরের কাছে গর্জে উঠল। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন—রক্তাক্ত, মারাত্মক জখম, কিন্তু বেঁচে রইলেন। একদল লালকুর্তি সৈন্য ওঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, তাদের বেয়োনেটের ফলায় তখন ব্যারাকপুরের শেষ বিকেলের সূর্য চমকাচ্ছে।
ইতিহাসের চিত্রনাট্য বজায় রইল।
সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে ব্যারাকপুরের সেই তপ্ত হাওয়াটা গঙ্গার কোল ঘেঁষে এক স্যাঁতসেঁতে ঠান্ডা বাতাসে রূপ নিল। সাহেবদের বাংলোর লণ্ঠনগুলো বটের ডালপালার আড়াল থেকে মিটমিট করে জ্বলছিল, আর সিপাহীদের লাইনগুলো ছিল এক থমথমে নীরবতায় ঢাকা।
নদীর ঘাটের পাশে এক পরিত্যক্ত গোয়ালঘরের ভেতরে বাতাসটা হঠাৎ করে সেই চেনা, নীল রঙের স্বচ্ছ বিকৃতিতে কাঁপতে শুরু করল—তেইশ শতকের রিট্রিভাল গেটটা খুলছে।
ঘনাদা সেখানে আগেই পৌঁছে গিয়েছিলেন; ওঁর কোর্তাটা ছিঁড়ে ফালা ফালা, মুখটা ভুষো কালিতে মাখা, কিন্তু ওঁর লম্বা আঙুলগুলো বড্ড যত্নে এক টুকরো ন্যাকড়ায় জড়িয়ে ধরে রেখেছে ক্রনোপ্যাজের সেই ভাঙা সময়-কাঁচের ফলার অবশিষ্টাংশ।
ঈশানী যখন দরজার পাশে এসে দাঁড়ালেন, ওঁর চোখের ইমপ্ল্যান্টের স্ক্রিনে তখন সেই সোনালি সুতোটা এক অটল, নিরেট দীপ্তিতে থিতু হয়ে গেছে। ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত আছে—যদিও সেই ভবিষ্যতের জন্ম হচ্ছে একটা ফাঁসির দড়ির ছায়া থেকে।
"টাইমলাইন সুরক্ষিত, ঘনাদা," ঈশানী এক ফাঁপা গলায় বললেন।
"হ্যাঁ," ঘনাদা গঙ্গার সেই কালচে জলের দিকে তাকিয়ে বললেন—যেখান দিয়ে একটা একলা ডিঙি নৌকা কলকাতার দিকে ভেসে যাচ্ছিল। "আমরা আমাদের পৃথিবীকে বাঁচালুম ঠিকই, ডক্টর সেন। তবে আমার মনে হয় এই উপত্যকার মানুষকে আমাদের এই সুরক্ষার দাম চোকাতে হবে আগামী একশো বছরের রক্ত আর চোখের জল দিয়ে।"
ঈশানী কোনো উত্তর দিলেন না। ওঁর কব্জির ট্র্যাকারের ভেতরে এক ছোট্ট, নতুন লাল রেখা মূল সোনালি সুতোর গায়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিল, যা কিছুতেই মুছে যেতে রাজি নয়।
"কী দেখছেন ওমন করে?" ঘনাদা ওঁর নীরবতা দেখে জিজ্ঞেস করলেন।
"হরেন পাল," ঈশানী ফিসফিস করে বললেন। "আমাদের মূল আর্কাইভে আজ ওঁর কলেরায় মারা যাওয়ার কথা ছিল—একদম অপরিচিত অবস্থায়। কিন্তু ও আজ ওই কয়লাটা মাড়িয়ে বেঁচে রইল। ও আরও ছ-মাস বাঁচবে। ও বহরমপুরে ওঁর ভাইয়ের কাছে গিয়ে এই মঙ্গল পাণ্ডের গল্পটা বলবে। ওঁর ভাই সেই গল্প বলবে গঙ্গার মাঝিদের। মাঝিরা সেই গল্প ওলটপালট করে বয়ে নিয়ে যাবে পাটনা আর এলাহাবাদের দিকে।"
ঘনাদার চোখ দুটো সরু হয়ে এল, ওঁর ধুলোমাখা গোঁফের আড়ালে এক খাঁটি, চিলতে হাসি ফুটে উঠল। "এক নতুন গুজব? যা আমাদের ব্যুরোর খেরোখাতায় কোনোদিন লেখাই ছিল না?"
"হ্যাঁ।"
"বিপজ্জনক কি?"
ঈশানী সেই নীল রিট্রিভাল গেটের আলোর দিকে পা বাড়ালেন। "জানি না, ঘনাদা। হয়তো ইতিহাস স্রেফ একটা বইয়ের পাতা নয় যা আপনি কলম দিয়ে এডিট করে দেবেন। হয়তো ইতিহাস একটা জ্যান্ত সত্তা, আর ও এখন আমাদের মতন মানুষদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর কায়দাটা শিখে গেছে।"
তারা যখন সেই নীল শূন্যতার ভেতরে পা রাখলেন যা তাঁদের চাঁদের কক্ষপথের সেই জীবাণুমুক্ত ঠান্ডা ল্যাবে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, ঠিক তখনই ঘনাদার হাতের সেই ভাঙা সময়-কাঁচের টুকরোটা আবার এক অদ্ভুত যান্ত্রিক সুরে কেঁপে উঠল। ওটার ধারালো কার্নিশের ওপর এক উজ্জ্বল লেখা ফুটে উঠল—এমন এক হরফে, যা আজ থেকে আরও চারশো বছর পরে জন্ম নেবে:
"পলাশী তো কেবল প্রথম তালা ছিল। তৃতীয় দরজাটা খুলবে ১৯০৫ সালের কলকাতায়। ক্ষমতা থাকলে আমাদের আটকে দেখাও।"
ঘনাদা নিজের ভাঙা গোঁফে হাত বুলিয়ে এক পরম তৃপ্তির হাসি হাসলেন—শরীরের প্রতিটা হাড়ের চোটকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। "বলেন কী মশাই! ১৯০৫-এর কলকাতা? বঙ্গভঙ্গ আর যুগান্তরের বোমার যুগ? তার মানে অ্যালবার্ট হলের চা আর বাগবাজারের রসগোল্লার মাঝখানে খেলাটা এবার আরও জমবে ভালো!"
ঈশানী নিজের ডিজিটাল ডায়েরিটা বন্ধ করলেন, ওঁর মুখের সেই তীক্ষ্ণ বক্ররেখায় এক অন্য রকম প্রত্যয়ের আলো। ইতিহাস তাঁদের দিকে এক নতুন যুদ্ধের চিঠি পাঠিয়ে






Comments